২৪ আইআইজি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিটিআরসির পাওনা ২০০ কোটি

২৪ আইআইজি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিটিআরসির পাওনা ২০০ কোটি

দেশের ৩৫টি আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৪টির কাছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) বকেয়া ও মূসক মিলিয়ে মোট বকেয়া পাওনা দাঁড়িয়েছে ২৫৫ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক লাইসেন্স ফি, রাজস্ব ভাগাভাগি, বিলম্ব ফি ও সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল (এসওএফ) বাবদ নিয়মিত বকেয়া ১৯৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। আর মূসক বাবদ পাওনা ৫৬ কোটি ৬০ লাখ টাকা, যা আইআইজি অ্যাসোসিয়েশনের দায়ের করা রিট মামলা চলমান থাকায় পৃথকভাবে দেখানো হয়েছে। তালিকায় সবচেয়ে বড় দেনাদার হিসেবে উঠে এসেছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) নাম, যার কাছে বকেয়া ও মূসক মিলিয়ে বিটিআরসির মোট পাওনা ১৪৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।

২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী প্রস্তুত করা এসব তথ্য সম্প্রতি কমিশনের এক সভায় উপস্থাপন করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। কমিশনের ওই সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, মোট নিয়মিত বকেয়ার মধ্যে রাজস্ব ভাগাভাগি খাতেই সবচেয়ে বেশি ১৩৮ কোটি ৪১ লাখ টাকা। এরপর বিলম্ব ফি বাবদ ৪৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা, এসওএফ বাবদ ১৪ কোটি ৭৮ লাখ টাকা এবং লাইসেন্স ফি বাবদ ৬০ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে। রাজস্ব ভাগাভাগি ও বিলম্ব ফি একত্রে মোট বকেয়ার সিংহভাগ জুড়ে থাকায় এটা স্পষ্ট হয় যে, নির্ধারিত সময়ে রাজস্ব জমা না দেওয়ার প্রবণতা যেমন রয়েছে, তেমনি বিলম্বের কারণে সৃষ্ট বাড়তি আর্থিক দায়ও ক্রমেই বাড়ছে।

বকেয়ার তালিকায় শীর্ষে থাকা বিটিসিএলের ক্ষেত্রে রাজস্ব ভাগাভাগি বাবদ ৯৩ কোটি ৪১ লাখ টাকা এবং বিলম্ব ফি বাবদ ২৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। এই দুই খাতে নিয়মিত বকেয়া দাঁড়িয়েছে ১২৩ কোটি ৮ লাখ টাকায়, যা এসওএফসহ মোট ১৩১ কোটি ৭৭ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। এর সঙ্গে মূসক বাবদ আরও ১৫ কোটি ১২ লাখ টাকা যুক্ত হয়ে প্রতিষ্ঠানটির কাছে কমিশনের সর্বমোট পাওনা দাঁড়ায় ১৪৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। কমিশনের নথি অনুযায়ী, বকেয়া পরিশোধের জন্য গত ১৬ জুলাই বিটিসিএলকে চিঠি দেওয়া হয়। একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কাছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির এত বিপুল অঙ্কের পাওনা জমে থাকার বিষয়টি বকেয়া আদায়ের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

তালিকায় দ্বিতীয় বৃহত্তম দেনাদার আমরা টেকনোলজিস লিমিটেড, যার কাছে বকেয়া ২৬ কোটি ৯২ লাখ টাকা এবং মূসক বাবদ আরও ২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরেই প্রতিষ্ঠানটির ওপর শতভাগ ক্যাপিং আরোপ করা হয়েছিল এবং সরকারি পাওনা আদায়ে পাবলিক ডিমান্ড রিকভারি (পিডিআর) আইনে মামলা চলমান থাকার পাশাপাশি এর লাইসেন্স বাতিলের প্রক্রিয়াও চলছে। এত ব্যবস্থা গ্রহণের পরও বকেয়া আদায়ে কতটা অগ্রগতি হয়েছে, তার স্পষ্ট হিসাব কমিশনের ওই সভার কার্যবিবরণীতে উল্লেখ নেই।

বকেয়া আদায়ে কমিশন সব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একই ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়নি। ম্যাংগো টেলিসার্ভিসেস, পিয়ারেক্স নেটওয়ার্কস, স্কাইটেল কমিউনিকেশন, গ্রিনম্যাক্স টেকনোলজিস, রেগো কমিউনিকেশন, একজাবাইট, কোরোনেট করপোরেশন, ভার্গো কমিউনিকেশন, প্ল্যানেট ইন্টারনেট গেটওয়ে ও ভেলোসিটি নেটওয়ার্কসের মতো প্রতিষ্ঠানকে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কিস্তিতে বকেয়া পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তবে নির্ধারিত সময়ে পরিশোধে ব্যর্থ হলে ২৫ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত ক্যাপিং আরোপের শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। অন্যদিকে নভোকম লিমিটেড ও গ্লোবাল ফেয়ার কমিউনিকেশনকে এক মাসের মধ্যে সমুদয় বকেয়া পরিশোধের জন্য চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। আর কোরোনেট করপোরেশন লিমিটেডের কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের আবেদন সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে কমিশন।

আইআইজি খাতের বাইরে নেশনওয়াইড আইএসপি লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান সিস্টেমস সলিউশনস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের ক্ষেত্রেও কঠোর অবস্থান নিয়েছে কমিশন। গত ২১ জুলাই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা প্রশাসনিক জরিমানা আরোপ করে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। ওই চিঠিতে ২ আগস্টের মধ্যে বকেয়া পরিশোধের নির্দেশনা ছিল। নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ না করে প্রতিষ্ঠানটি ১৭ আগস্ট ছয়টি সমান মাসিক কিস্তিতে বকেয়া পরিশোধের সুযোগ চেয়ে আবেদন করে। সেইসঙ্গে বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতির কারণে একত্রে পরিশোধ দুরূহ উল্লেখ করে গত ১৭ সেপ্টেম্বর ৫০ হাজার টাকা পরিশোধ করে অবশিষ্ট ২ লাখ টাকা কিস্তিতে দেওয়ার অনুরোধ জানায় । তবে কমিশন সভায় এই আবেদন অনুমোদন না করে জরিমানাসহ সমুদয় বকেয়া পত্র জারির ১৫ দিনের মধ্যে পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয় এবং নির্ধারিত সময়ে তা করতে ব্যর্থ হলে ২৫ শতাংশ ক্যাপিং আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

আইআইজি প্রতিষ্ঠানের বকেয়ার বাইরে মূসক আদায়েও জটিলতার চিত্র রয়েছে। ফাইবার অ্যাট হোম গ্লোবাল লিমিটেডের নিয়মিত বকেয়া না থাকলেও মূসক বাবদ পাওনা ৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকা, যা নিয়ে রিট মামলা চলমান। একই ধরনের মূসক সংক্রান্ত মামলার তালিকায় রয়েছে—সামিট কমিউনিকেশন ৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা, উইন্ডস্ট্রিম কমিউনিকেশন ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ও স্টারট্রেক টেলিকম ১৮ লাখ টাকা। লেভেল-৩ ক্যারিয়ার লিমিটেডের নিয়মিত বকেয়া ৪ কোটি ৩৯ লাখ টাকা এবং মূসক বাবদ আরও ১২ কোটি ৫৭ লাখ টাকা পাওনা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি এর আগে প্রদত্ত কিস্তি হালনাগাদ রেখেছে বলে কমিশনের মন্তব্যে উল্লেখ রয়েছে।

কার্যক্রম বন্ধ থাকা বা অনুৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানের বকেয়া নিয়েও জটিলতা দেখা গেছে। বাংলা ফোন লিমিটেডের লাইসেন্স ২০১৯ সালে বাতিল করা হলেও কমিশনের সিদ্ধান্তে গত ২৩ মে তা পুনরায় চালু হওয়ায় নতুন করে বকেয়ার সৃষ্টি হয়েছে, যা নিয়ে ইঅ্যান্ডও বিভাগে নোট পাঠানো হয়েছে। ম্যাক্সনেট অনলাইন, টরন লিমিটেড ও ওয়ান এশিয়া অ্যালায়েন্সের মতো অনুৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানের কাছেও বার্ষিক লাইসেন্স ফি বকেয়া থাকায় তাদের তাগাদাপত্র পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন।

মূল প্রতিবেদন: Voice of Startup Bangladesh

← সব সংবাদ