ফ্লপি ডিস্কের লিরিক্স থেকে ২৫ লাখ সাবস্ক্রাইবারের ইউটিউব সেনসেশন: এআই-চালিত মিউজিক ব্র্যান্ড ‘সার্টেন কল’

ফ্লপি ডিস্কের লিরিক্স থেকে ২৫ লাখ সাবস্ক্রাইবারের ইউটিউব সেনসেশন: এআই-চালিত মিউজিক ব্র্যান্ড ‘সার্টেন কল’

কিশোর বয়সে নিজের বেডরুমে বসে গার্ল-ব্যান্ডের জন্য গান লিখতেন এক তরুণ। সেই গানের কথাগুলো পরম যত্নে সেভ করে রাখতেন তৎকালীন ফ্লপি ডিস্কে। সময় গড়িয়েছে, কেটে গেছে প্রায় ৩০ বছর। কিন্তু সেই পুরোনো স্বপ্নগুলো হারিয়ে যায়নি, বরং আধুনিক আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ছোঁয়ায় তা আজ পরিণত হয়েছে এক গ্লোবাল সেনসেশনে!

এই জাদুকরী উদ্যোগের নাম 'সার্টেন কল' (Certain Call)—একটি সম্পূর্ণ এআই-চালিত ফিকশনাল (কাল্পনিক) চার সদস্যের পপ গ্রুপ, যা এককভাবে তৈরি করেছেন ব্রিটিশ ক্রিয়েটর ও গীতিকার ক্রেইগ রেইবোল্ড (Craig Raybould)। বর্তমানে ইউটিউবে এই প্রজেক্টটির সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা ২৫ লাখ (২.৫ মিলিয়ন) ছাড়িয়ে গেছে, যা ডিজিটাল এন্টারটেইনমেন্টের দুনিয়ায় এক নতুন মাইলফলক।

এআই এবং মানুষের সৃজনশীলতার অভূতপূর্ব মেলবন্ধন
'সার্টেন কল' মূলত ২০০০-এর দশকের নস্টালজিক আরএন্ডবি (R&B) পপ ঘরানার মিউজিক তৈরি করে। মজার বিষয় হলো, এই বিশাল ব্যান্ডের পেছনে কোনো বড় প্রোডাকশন হাউস নেই। একজন ইনডিপেনডেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে ক্রেইগ একাই এই পুরো প্রজেক্টটি পরিচালনা করেন। গান লেখা থেকে শুরু করে মিউজিক ডিরেকশন, ভিডিও এডিটিং এবং প্রোডাকশন—সবকিছুই করেন তিনি। ফ্লপি ডিস্কে জমিয়ে রাখা নিজের লেখা সেই পুরোনো লিরিক্সগুলোকেই আধুনিক এআই টুলের সাহায্যে তিনি পূর্ণাঙ্গ মিউজিক ট্র্যাক এবং হাই-কোয়ালিটি মিউজিক ভিডিওতে রূপান্তর করেছেন।

ক্রেইগের মতে, "এআই আমাকে মিউজিক, ভোকাল এবং ভিজ্যুয়াল ম্যাটেরিয়াল প্রডিউস করতে সাহায্য করে যা বাস্তবে একা আমার পক্ষে তৈরি করা সম্ভব ছিল না, তবে আইডিয়া এবং ডিরেকশনটা আমারই থাকে।" তিনি লিরিক্সগুলো নিজে লেখেন এবং এরপর 'Suno'-র মতো এআই টুল ব্যবহার করে মিউজিক ও ভোকাল জেনারেট করেন। এরপর সেগুলো ডাউনলোড করে 'Studio One'-এ নিজের মতো করে এডিট ও মিক্সিং করেন।

চার কাল্পনিক সদস্য ও তাদের ভিন্ন ব্যক্তিত্ব
ক্রেইগ 'সার্টেন কল'-এর চার কাল্পনিক সদস্য—তাহলিয়া, সিয়েরা, মায়া এবং ইমানি—এর প্রত্যকের জন্য আলাদা আলাদা ব্যক্তিত্ব এবং ভিজ্যুয়াল স্টাইল তৈরি করেছেন। এআই-এর মাধ্যমে তিনি এই চরিত্রগুলোকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন এবং তাদের প্রত্যেকের জন্য একটি নিজস্ব ব্যাকস্টোরিও তৈরি করেছেন।

বাংলাদেশ কানেকশন: শীর্ষ ওয়াচ-টাইম
ক্রেইগের এই ডিজিটাল এন্টারটেইনমেন্ট প্রজেক্টটি সারা বিশ্বে জনপ্রিয় হলেও, এর একটি চমৎকার ও চমকপ্রদ 'বাংলাদেশ কানেকশন' রয়েছে। ক্রেইগ জানান, 'সার্টেন কল'-এর ইউটিউব চ্যানেলে সবচেয়ে বেশি ওয়াচ টাইম (Watch time) বা দর্শক আসে বাংলাদেশ থেকে! অক্টোবর মাসের ইউটিউব অ্যানালিটিক্স অনুযায়ী, মোট ওয়াচ টাইমের প্রায় ১৪% আসে বাংলাদেশ থেকে, যা অন্য যেকোনো দেশের চেয়ে বেশি।

ক্রেইগ বলেন, "এটি সত্যিই দারুণ যে, যুক্তরাজ্যে তৈরি করা একটি প্রজেক্ট এত দূরের মানুষের কাছে পৌঁছেছে। আমি সত্যিই এই সাপোর্টের জন্য কৃতজ্ঞ।"

প্যাশন থেকে লাভজনক ডিজিটাল ব্যবসা
শুরুতে একটি ব্যক্তিগত প্যাশন প্রজেক্ট হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও, এটি এখন একটি লাভজনক ডিজিটাল এন্টারটেইনমেন্ট ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। চ্যানেলে বর্তমানে ৯১৯টিরও বেশি ভিডিও রয়েছে এবং এটি নিয়মিত ইউটিউব অ্যাডভার্টাইজিং থেকে রেভিনিউ জেনারেট করছে। এছাড়াও, চ্যানেল মেম্বারশিপ এবং মার্চেন্ডাইজিং (যেমন ভিনাইল অ্যালবাম) এর মাধ্যমেও প্রজেক্টটি সম্প্রসারিত হচ্ছে।

ক্রিয়েটর ইকোনমির নতুন দিগন্ত
'সার্টেন কল'-এর এই বিশাল সাফল্য ক্রিয়েটর ইকোনমিতে একটি নতুন পথ দেখাচ্ছে। এটি প্রমাণ করে যে, এআই মানুষের সৃজনশীল প্রতিভাকে প্রতিস্থাপন করছে না, বরং একজন স্বাধীন ক্রিয়েটরকে বিশাল বাজেটের স্টুডিও ছাড়াই একটি গ্লোবাল ব্র্যান্ড দাঁড় করাতে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।

ক্রেইগ মনে করেন, "এআই ইনডিপেনডেন্ট ক্রিয়েটরদের এমন প্রজেক্ট করার ক্ষমতা দেয় যা আগে বিশাল টিম এবং বাজেটের ব্যাপার ছিল। তবে আমি মনে করি না এর মানে মানব মিউজিশিয়ান বা পারফরমাররা হারিয়ে যাবে। এআই প্রথাগত মিউজিকের পাশাপাশি টিকে থাকবে।"

ক্রেইগ রেইবোল্ডের এই জাদুকরী এআই গার্ল-ব্যান্ডের গান শুনতে ও দেখতে ভিজিট করতে পারেন 'সার্টেন কল'-এর অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে: https://www.youtube.com/@CertainCall

মূল প্রতিবেদন: Voice of Startup Bangladesh

← সব সংবাদ